1. sparkleit.bd@gmail.com : K. A. Rahim Sablu : K. A. Rahim Sablu
  2. diponnews76@gmail.com : Debabrata Dipon : Debabrata Dipon
  3. admin@banglanews24ny.com : Mahmudur : Mahmudur Rahman
  4. mahmudbx@gmail.com : Monwar Chaudhury : Monwar Chaudhury
একটি করুণ অধ্যায় এবং সিলেটের শহিদমিনার
শুক্রবার, ৩১ মার্চ ২০২৩, ০৫:১১ পূর্বাহ্ন




একটি করুণ অধ্যায় এবং সিলেটের শহিদমিনার

কনোজ চক্রবর্তী বুলবুল
    আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০২২, ১০:২৩:৫২ অপরাহ্ন

‘৫২’ থেকে ‘৭১’। বাক স্বাধীনতা এবং পরাধীনতার ছোবল থেকে জাতিকে রক্ষা করার জন্য বাংলার দামাল ছেলেরা যুদ্ধে নেমেছিল। ‘৫২’ তে নিজের মাতৃভাষাকে বিশ্বের দরবারে স্থান দেওয়ার জন্য সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার সহ একঝাঁক তরুণের আত্মাহুতির ফলে আজ আমরা বাংলায় কথা বলতে পারছি। যা এখন সমগ্র বিশ্বে একুশে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা দিবস হিসাবে পালিত হচ্ছে। এটা বাঙ্গালী জাতির গর্বের বিষয়।

তারই ধারাবাহিকতায় আসলো ১৯৭১। পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী রাতের আঁধারে বাঙ্গালী জাতির উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তার প্রতিবাদে আবার সেই দামাল ছেলেরা প্রায় রিক্ত হস্তে এদেরকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে যুদ্ধে নামলো। রক্তক্ষয়ী এই যুদ্ধে ঝরে গেল অনেক তাজা প্রাণ। সম্ভ্রম হারালো অনেক মা-বোন। তবুও বাঙ্গালী জাতি পিছু হঠেনি। দীর্ঘ নয়টি মাস সম্মুখ সমরে অংশ নিয়ে ছিনিয়ে এনেছিল লাল-সবুজ পতাকার স্বাধীন বাংলাদেশ। আমরা গর্বিত এই সকল দামাল ছেলেদের প্রতি।

এই যে বাক স্বাধীনতা এবং পরাধীনতার হাত থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে যে সকল দামাল ছেলেরা শহীদ হয়েছিল, তাদের স্মৃতিতে সারা বাংলায় গড়ে উঠেছিল শহীদ মিনার। যাতে করে ঐ সকল দিবসে জাতি তাদেরকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।
সিলেটে এর ব্যতিক্রম হয়নি। পাড়ায় পাড়ায় নির্মিত হয়েছিল শহীদ মিনার। বিভিন্ন জাতীয় দিবসে সিলেটবাসী মিনারের পাদদেশে শহীদদের প্রতি সম্মান জানায়। মিনারের অবমাননা কেউ সহ্য করবে না। পবিত্র মিনারকে নিয়ে এই সিলেটে কি ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটেছিল তার একটা করুণ অধ্যায় বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে চাই।

স্বাধীনতা পরবর্তী এই সিলেটে হাতেগোনা কয়েকটি শহীদ মিনার ছিল। অস্থায়ী মিনার হিসাবে তখন চিহ্নিত করা হয়, সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সংলগ্ন নির্মিত শহীদ মিনারকে। যার পরিসর ছিল অনেকটা বড়। প্রতিটি দিবসে বিভিন্ন পেশার মানুষ এই শহীদ মিনারের পাদদেশে এসে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতো।

সালটা ছিল ১৯৭৪। স্বাধীনতার রক্তের দাগ তখন পর্যন্ত পুরোপুরি শুকায়নি। ঐ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ২৩ তারিখ বিকেল বেলা ২১শে স্মরণে মিনার প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠান চলছিল।
আয়োজনে ছিল সিলেট তথা বাংলাদেশের প্রাচীনতম শিশু-কিশোর সংগঠন সুরমা খেলাঘর আসর। আমার স্মৃতিতে উক্ত অনুষ্ঠানে যারা ছিলেন তাদের নাম যথাক্রমে- শ্রদ্ধেয় তবারক হোসেন, অধ্যাপক মো.শফিক, পরিমল মজুমদার, সুধাময় মজুমদার, ফজল মাহমুদ, ভীষ্মদেব চৌধুরী, সেলু বাসিত, রমাপদ ভট্টাচার্য্য, গোবিন্দ পাল, মায়া কর, শেখর ভট্টাচার্য্য, আনোয়ার ইকবাল কচি, সন্তু চৌধুরী প্রমুখ। মাইকে ধ্বনিত হয়েছিল ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি’। পাশের মসজিদ থেকে পবিত্র আজান শোনা যাওয়ার সাথে সাথে কিছুক্ষণের জন্য বিরতি দেওয়া হয়। প্রায় মিনিট পনেরো পর পুনরায় অনুষ্ঠান শুরু হয়। দর্শকের সারিতে অনেক গুণী মানুষ বসে অনুষ্ঠান উপভোগ করছেন। কারণ তখনকার সময় এই ধরণের অনুষ্ঠান কম ছিল। হঠাৎ করে লাঠি হাতে কিছু উশৃঙ্খল যুবক অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণের দিকে ছুটে আসে। মুখে তাদের শ্লোগান পাকিস্তান জিন্দাবাদ। কোন কিছু বোঝার আগেই ওরা হামলা চালায় অনুষ্ঠানের উপর। এলোপাতাড়িভাবে ছোড়াছোড়ি করে চেয়ার, মাইক্রোফোন।

আমরা যারা অনুষ্ঠান করছিলাম তাদের সকলকে আহত করে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। এরপরও ওরা ক্ষান্ত হয়নি। পেট্রোল দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় পবিত্র মিনার। অস্তিত্ববিহীন হয়ে যায় মিনার প্রাঙ্গণটি। এরপর এর পুন:সংস্কারের কথা কারো মাথায় আসেনি। সুরমা খেলাঘর আসর অর্থনৈতিকভাবে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেটা পূরণ করতে এগিয়ে আসে সিলেটের বৈশাখী নাঠ্যগোষ্ঠী। তারা দু’টি নাটক ‘জনতার আদালত’ এবং ‘পলাতক পালিয়ে গেছে’ প্রদর্শন করে প্রাপ্য অর্থ আমাদেরকে দান করে। পরবর্তীতে মদন মোহন কলেজের শহীদ মিনারটিকে সিলেটবাসী অস্থায়ী মিনার হিসাবে মেনে নেয়। আমি তখন চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র। তখন কতইবা আর বয়স। ঐদিন আততায়ীর হাত থেকে আমিও রেহাই পাইনি। সেই কালো অধ্যায় এখনও আমার চোখের সামনে ভাসে।

আরেকটি করুণ অধ্যায়ের কথা বলি। স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ হন সিলেটের কাজল পালসহ বেশ কয়েকজন যোদ্ধা। তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে গড়ে উঠেছিল সিলেট রামকৃষ্ণ মিশন সংলগ্ন শহীদ মিনার। কোন একদিন রাতের আঁধারে কে বা কাহারা পবিত্র মিনারকে ভেঙ্গে পাশের পুকুরে ফেলে দেয়। যার ধ্বংসস্তুপকে পরবর্তীতে মানুষ দীর্ঘদিন কাপড় কাঁচার সিঁড়ি হিসাবে ব্যবহার করে। এটাও কেউ সংস্কারের কথা ভাবেনি। সবচেয়ে আশ্চর্য্যরে ব্যাপার হলো, বেশ কয়েক বছর পর আমি যখন এই মিনার নিয়ে লিখা শুরু করি তখন লিখার উপর প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। এদের একজনের অভিমত এটা নাকি প্রকৌশলীর গাফিলতির কারণে হয়েছে। তাই যদি হয় তাহলে দীর্ঘদিন কেন কিছুই হলো না। অথচ তিনিও এই নির্মাণ কমিটির একজন সদস্য ছিলেন। মানলাম সবকিছু কিন্তু পরবর্তীতে এই মিনারের পুন: নির্মাণের কেন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি?

আরেকটি শহীদ মিনার ছিল সোবহানীঘাট পয়েন্টে। সেটাও হঠাৎ করে একদিন বিলীন হয়ে যায়। এতেই বোঝা যায় স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি এই দেশে এখনো বিচরণ করেছে।
অনেক আন্দোলনের ফসল বর্তমান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। এই মিনারের পবিত্রতা রক্ষায় সিলেটের নাট্য ও সংস্কৃতিকর্মীরা সদা জাগ্রত। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এখনো দেখা যায় জুতো পায়ে মিনারের বেদীতে অনেকেই উঠে যায়। কেন এই অবমাননা ? এই পবিত্র মিনার সকল ধর্মের একটি পূণ্য স্থান। কার আগে কে বেদীতে উঠবে তাই নিয়ে হট্টগোল! মিনারের বেদীতে যারা ফুল দিয়ে যায় সেটাকে তারা পদধুলিত করতে দ্বিধাবোধ করে না। এই মিনারের পবিত্রতা রক্ষা করা আমার, আপনার সকলের। আমরা যদি সচেতন না হই তাহলে অপশক্তিকে রুখতে পারা যাবে না। যদি সচেতন থাকতাম তাহলে মিনারের পাশে “জুতা পায়ে বেদীতে উঠা নিষেধ” এই সাইনবোর্ডটি লিখতে হতো না। আসুন আমরা সবাই মিলে এই মিনারের পবিত্রতা রক্ষা করি। যাতে করে দেশ রক্ষায় আত্মদান সকল যোদ্ধাদের আত্মা শান্তি পায়।

লেখক : নাট্যকার ও ছড়াকার




খবরটি এখনই ছড়িয়ে দিন

এই বিভাগের আরো সংবাদ







Copyright © Bangla News 24 NY. 2020