1. sparkleit.bd@gmail.com : K. A. Rahim Sablu : K. A. Rahim Sablu
  2. diponnews76@gmail.com : Debabrata Dipon : Debabrata Dipon
  3. admin@banglanews24ny.com : Mahmudur : Mahmudur Rahman
  4. mahmudbx@gmail.com : Monwar Chaudhury : Monwar Chaudhury
সত্যিই কী ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ আসছে?
রবিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২২, ০৫:২৮ পূর্বাহ্ন




সত্যিই কী ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ আসছে?

জসীম উদ্দীন মাসুদ
    আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২২, ৬:৪৭:৩৮ অপরাহ্ন

বর্তমানে সমগ্র বিশ্বজুড়েই দেখা দিয়েছে খাদ্য সংকট। বিশ্ব অর্থনীতিতে দেখা যাচ্ছে মন্দার আভাস। সারাবিশ্বজুড়েই মূল্যস্ফীতি ঐতিহাসিকভাবে ঊর্ধ্বগতিতে থাকায় বাংলাদেশসহ বহু দেশের মানুষ প্রয়োজনীয় খাদ্য কিনতে পারছেনা।

অনেকে বলছে ভেতরে ভেতরে একটা নীরব দুর্ভিক্ষ চলছে এবং আগামী বছর এটা আবির্ভূত হবে ভয়াবহ আকারে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পক্ষ থেকে ২০২৩ সালের সম্ভাব্য খাদ্য ঘাটতির আশংকায় নানা ধরণের সতর্ক বার্তা দেয়া হচ্ছে।

২০২৩ সালে কি সত্যি সত্যিই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ আসতে যাচ্ছে? আর যদি দুর্ভিক্ষ আসেও তাহলে এর স্বরূপ কেমন হবে।

সাম্প্রতিককালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বেশ কয়েকবার দুর্ভিক্ষ পূর্ববর্তী প্রস্তুতি নেয়ার জন্য দেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহবান জানিয়েছেন। তাহলে ২০২৩ সালে কি সত্যি সত্যিই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ আসতে যাচ্ছে? আর যদি দুর্ভিক্ষ আসেও তাহলে এর স্বরূপ কেমন হবে, এর স্থায়িত্ব অথবা ধ্বংসলীলা কতদূর গড়াবে সে প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে সকলের ভাবনাজুড়ে।

দুর্ভিক্ষ কী?

মানুষের স্বাভাবিক জীবনধারণের জন্য ৫টি মৌলিক অধিকার হলো খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ অধিকার হলো প্রাপ্যতার ভিত্তিতে খাদ্যের নিশ্চয়তা বিধান। খাদ্যের অভাবে যখন অনাহারজনিত পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং যা অন্যান্য মৌলিক অধিকার প্রাপ্তিতে নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে সেই চরম অবস্থাকে দুর্ভিক্ষ বলে।

সাধারণত জনগণের জন্য প্রয়োজন মেটানোর মতো খাদ্য সরবরাহ না থাকলে দুর্ভিক্ষ সংগঠিত হয়।

সাধারণত জনগণের জন্য প্রয়োজন মেটানোর মতো খাদ্য সরবরাহ না থাকলে দুর্ভিক্ষ সংগঠিত হয়। ফসলহানি, যুদ্ধবিগ্রহ, মূল্যস্ফীতি, জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যার ভারসাম্যহীনতা, ব্যাপক দারিদ্র্য, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, সরকারের নীতিগত ব্যর্থতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি কারণে স্বাভাবিক খাদ্য সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং দুর্ভিক্ষের আবির্ভাব ঘটে।

দুর্ভিক্ষ নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিশ্ব নেতৃবৃন্দের আশংকা

খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা ইতোমধ্যে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে আগামী বছর খাদ্য সংকট জোরালো হওয়ার আভাস দিয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ইতোমধ্যে জানিয়েছে ২০২৩ সালে বাংলাদেশসহ ৪৫ টি দেশে তীব্র খাদ্য ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এসব দেশের প্রায় ২০ কোটি মানুষ অত্যন্ত ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারে।

২০২৩ সালে বাংলাদেশসহ ৪৫ টি দেশে তীব্র খাদ্য ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এসব দেশের প্রায় ২০ কোটি মানুষ অত্যন্ত ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারে।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রধান নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ী ডেভিড বিসলে বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের খাদ্য উৎপাদন কমে যাবে। এর দুটি বড় কারণ হবে যুদ্ধ এবং সারের সংকট। তিনি আরও বলেন, এটি এমন এক ধরণের সংকট হতে যাচ্ছে যা আমাদের জীবদ্দশায় দেখিনি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এক রিপোর্টে বলেছে, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে সারের সংকট তৈরি হয়েছে।

এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে আফ্রিকা মহাদেশের খাদ্য উৎপাদন ২০ শতাংশ কমে যাবে। চলতি বছরের জুন মাসে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, ২০২২ সালে কয়েকটি দুর্ভিক্ষ ঘোষণার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে এবং ২০২৩ সালে এ পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

৩০ কোটিরও বেশি মানুষ ক্ষুধার জ্বালায় জ্বলছে। এই সংখ্যা ক্রমেই বাড়বে।

জার্মানির অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন মন্ত্রী সভেনজা শুলজে বলেছেন, “জাতিসংঘের খাদ্য সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩০ কোটিরও বেশি মানুষ ক্ষুধার জ্বালায় জ্বলছে। এই সংখ্যা ক্রমেই বাড়বে।” কারণ হিসেবে তিনি ব্যখ্যা করে বলেন, “খাবারের দাম ব্যাপক বেড়ে গিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবথেকে ভয়ঙ্কর অবস্থার মুখোমুখি গোটা বিশ্ব। এর ফলে কয়েক লাখ মানুষ মারা যেতে পারেন।”

আইএমএফ প্রধান জর্জিয়েভা বলছেন, ‘অর্থনৈতিক দুরবস্থার অন্ধকার নেমে আসতে পারে আগামী বছর। একাধিক ধাক্কা, তার মধ্যে আবার বুদ্ধিহীন যুদ্ধ অর্থনৈতিক চিত্রকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। অস্থায়ী হওয়ার বদলে মূল্যস্ফীতি আরও স্থায়ী হয়েছে।’ তার মতে, ২০২৬ সালের মধ্যে প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে, যা জার্মানির জাতীয় অর্থনীতির সমান। নিঃসন্দেহে এটি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বিশাল ধাক্কা হতে যাচ্ছে। এমনকি এই পরিস্থিতি ভালো হওয়ার বদলে উল্টো খারাপ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

বর্তমানে রাশিয়ান গ্যাসের মূল্য টের পাচ্ছে ইউরোপ। গভীর মন্দার সম্মুখীন হচ্ছে চীনের বাজার।

বিশ্বের অর্থনৈতিক দুর্দশার একটি ভয়াবহ চিত্র বর্ণনা করে গিয়ে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে রাশিয়ান গ্যাসের মূল্য টের পাচ্ছে ইউরোপ। গভীর মন্দার সম্মুখীন হচ্ছে চীনের বাজার। মূল্যস্ফীতি আর ক্রমবর্ধমান সুদের হার ভোক্তাদের মনে সংশয় সৃষ্টি করছে। বিনিয়োগ আটকে দেওয়ার কারণে মার্কিন অর্থনীতিও গতি হারাচ্ছে। উদীয়মান বাজার এবং উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো খাদ্য ও জ্বালানির উচ্চ দামের মোকাবিলা করার জন্য আরও খারাপ অবস্থানে রয়েছে, বিশেষ করে তাদের রপ্তানির চাহিদা কমে যাওয়ায়।’

২০২৩ সালে সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষের কারণ

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক অস্থিরতা, সারসহ কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি ও জলবায়ুজনিত কারণে আন্তর্জাতিকভাবে খাদ্যসামগ্রীর উৎপাদন কমে যেতে পারে।

বাজার মনিটর ও আন্তর্জাতিক শস্য কাউন্সিল থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে গত ১৮ অক্টোবর বিশ্বব্যাংক এক প্রতিবেদনে তৈরি করেছে। এতে তারা বলেছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক অস্থিরতা, সারসহ কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি ও জলবায়ুজনিত কারণে আন্তর্জাতিকভাবে খাদ্যসামগ্রীর উৎপাদন কমে যেতে পারে। পৃথিবীর ৪৫টি দেশের সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষের জন্য মোটাদাগে নিম্নোক্ত কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে।

রাশিয়া- ইউক্রেন যুদ্ধ

ইউক্রেন একাই বিশ্বের ৪০ শতাংশ সূর্যমুখী তেল ও ১৬ শতাংশ ভুট্টা উৎপাদন করে।

সমগ্র বিশ্বের প্রায় তিনভাগের একভাগ গম এবং বার্লি উৎপাদিত হয় রাশিয়া এবং ইউক্রেনের বিস্তৃত শস্যক্ষেত্রে। শুধু তাই নয়, বৈশ্বিক চাহিদার ৭০ ভাগ সূর্যমুখী তেল আসে এই অঞ্চল থেকে। ইউক্রেন একাই বিশ্বের ৪০ শতাংশ সূর্যমুখী তেল ও ১৬ শতাংশ ভুট্টা উৎপাদন করে।

যুদ্ধ শুরু হবার পর থেকে এই অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়েছে। ফলে বিশ্বের প্রয়োজনীয় ধাদ্য ঘাটতি তৈরি হয়েছে। একই কারণে বেশ কিছুদিন আগে ভোজ্য তেলের একটি সংকট তৈরি হয়েছিল। সেই প্রভাবে বাংলাদেশের বাজারে সয়াবিন তেলের দাম লাগামছাড়া হয়ে উঠে।

অবস্থা যেহেতু এখনও খুব বেশি স্থিতিশীল নয় সেহেতু রাশিয়া এবং ইউক্রেন থেকে আসা খাদ্যেও বিশাল এক ঘাটতি থেকে যাবে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুধু এই অঞ্চলেই নয় বরং সমগ্র বিশ্বের খাদ্য উৎপাদনে ঘাটতির পেছনে মুখ্য ভূমিকা রাখছে। রাশিয়া বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচিকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, তাদের নিজেদের ওপর পশ্চিমা অবরোধ সরানো না হলে তারা কোনোভাবেই ওডেসার অবরোধ সরিয়ে নেবে না, এমনকি শিথিলও করবে না।

জলবায়ু পরিবর্তন
২০২৩ সালের সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কারণটি হলো জলবায়ুজনিত। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সারা পৃথিবীতেই খাদ্য উৎপাদন অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। কোথাও হচ্ছে অতিবন্যা, কোথাও লেগে আছে খরা। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে ১২০ কোটিরও বেশি লোক সরাসরি বন্যার ঝুঁকির মধ্যে বাস করছে। চলতি বছর এপ্রিলে অসময়ের বন্যায় বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ শস্যের ক্ষতি হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সারা পৃথিবীতেই খাদ্য উৎপাদন অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। কোথাও হচ্ছে অতিবন্যা, কোথাও লেগে আছে খরা। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে ১২০ কোটিরও বেশি লোক সরাসরি বন্যার ঝুঁকির মধ্যে বাস করছে।

শুধু এশিয়া নয়, অস্ট্রেলিয়া থেকে নাইজেরিয়া, ভেনিজুয়েলা থেকে ক্যালিফোর্ণিয়া পৃথিবীর কোন অঞ্চলই বন্যার প্রকোপ মুক্ত নয়। পক্ষান্তরে পৃথিবীর বহু উর্বর অঞ্চলে পানির অভাবে দেখা দিচ্ছে ব্যাপক খরা। অস্ট্রেলিয়া বন্যার পাশাপাশি খরার দিক থেকেও শীর্ষে রয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার খাদ্য রপ্তানিকারক দেশগুলোতে বিগত এক হাজার বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ খরা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। চিলিতে প্রায় ১৩ বছর ব্যাপী মহাখরা চলছে। এছাড়া মেক্সিকো, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, বলিভিয়াসহ বেশ কিছু দেশে খরার কারণে ভুট্টা, সয়াবিন, কফি, চিনি এবং তুলার মত চাহিদাসম্পন্ন শস্যের ব্যাপক ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

বৈরী আবহাওয়ার প্রভাবে এ বছর খাদ্যশস্যের বৈশ্বিক উৎপাদন গত বছরের তুলনায় ৩ কোটি ৪০ লাখ টন কমবে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গ্রেইন কাউন্সিল (আইজিসি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈরী আবহাওয়ার প্রভাবে এ বছর খাদ্যশস্যের বৈশ্বিক উৎপাদন গত বছরের তুলনায় ৩ কোটি ৪০ লাখ টন কমবে। মূলত ভুট্টা উৎপাদনে নিম্নমুখিতা বৈশ্বিক উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এ বছর ভুট্টার মোট উৎপাদন গত বছরের তুলনায় প্রায় পাঁচ কোটি টন কমবে। আইজিসি জানায়, তুলনামূলক শুষ্ক ও উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে এ বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোয় ভুট্টার আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

করোনা মহামারি
দু’বছর ধরে করোনা মহামারী বিশ্ব অর্থনীতিতে যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে সেটি এখনও কাটিয়ে উঠা সম্ভব হয়নি। মহামারীর সময় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের যে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল তার ফলে বিশ্বব্যাপী খাদ্যদ্রব্যের দাম অনেক বেড়ে যায়। এখনও যেভাবে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ছে তাতে আগামী বছর খাদ্য কেনা অনেকের জন্যই কঠিন হয়ে যাবে। শুধু খাদ্যদ্রব্যই নয় সামগ্রিকভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টিও খাদ্য ঘাটতির কারণ হতে পারে।

মহামারীর সময় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের যে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল তার ফলে বিশ্বব্যাপী খাদ্যদ্রব্যের দাম অনেক বেড়ে যায়। এখনও যেভাবে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ছে তাতে আগামী বছর খাদ্য কেনা অনেকের জন্যই কঠিন হয়ে যাবে।

খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে হিমসিম খাচ্ছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছে, ২০১৯ সালের তুলনায় এখন তাদের পরিচালনা ব্যয় যে পরিমাণ বেড়েছে সেই টাকা দিয়ে প্রতি মাসে তারা আরও ৪০ লাখ বেশি মানুষকে খাওয়াতে পারতো।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধগতি
বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি খাদ্যের মূল্যস্ফীতির পালেও ঝড়ো বাতাস বইছে। বিশ্বব্যাপী এ হার গড়ে ১০ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত উঠতে পারে। কোনো কোনো দেশে এ হার আরও ৬৮ শতাংশ পর্যন্ত উঠতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, খাদ্য পণ্যে মূল্যস্ফীতির হার সবচেয়ে বেশি জিম্বাবুয়েতে ৬৮ শতাংশ, দ্বিতীয় অবস্থানে লেবানন ৩৬ শতাংশ, তৃতীয় অবস্থানে ইরান ৩২ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলংকাতে ১৪ শতাংশ, পাকিস্তানে ১৮ শতাংশ, ভারতে সাড়ে ৮ শতাংশ, নেপালে সাড়ে ৭ শতাংশ, মিয়ানমারে ১১ শতাংশ।

বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি গত ১১ বছরের মধ্যে সর্বোচচ পর্যায়ে রয়েছে। এই হার এখন শতকরা প্রায় ১০ ভাগ ছুঁই ছুঁই। আর খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে বেশি।

বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি গত ১১ বছরের মধ্যে সর্বোচচ পর্যায়ে রয়েছে। এই হার এখন শতকরা প্রায় ১০ ভাগ ছুঁই ছুঁই। আর খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে ২০১১ সালের মে মাসে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি হয়েছিলো ১০.২ শতাংশ। এরপর মূল্যস্ফীতি আর কখনোই ৯ ভাগ ছাড়ায়নি৷। চলতি আগস্ট এবং সেপ্টেম্বরে তা ছাড়িয়ে গেল।

সমগ্র বিশ্বের প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সারের বিশাল একটি অংশ তৈরি হয় রাশিয়ায়। পৃথিবীর ২৫% নাইট্রোজেন সার, ২২% অ্যামোনিয়া সার, ১৪% ইউরিয়া সার ও ১৪% ফসফেট সার উৎপাদন করে রাশিয়া। ইউক্রেনেও অনেক ধরণের রাসায়নিক সারের কারখানা রয়েছে।

যুদ্ধ শুরু হবার পর থেকে এই অঞ্চলের সার রফতানি হয়নি বললেই চলে। শুধু তাই নয় প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও সার উৎপাদনের খরচ অনেক বেড়ে গেছে।

খাদ্য এবং সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ৪৮টি দেশকে অতিরিক্ত ৯ বিলিয়ন ডলার খরচ করতে হবে। সারের দাম সর্বোচ্চ হওয়ায় আশংকা করা হচ্ছে আগামী বছর হয়তো সার পাওয়াই যাবেনা।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাদ্য এবং সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ৪৮টি দেশকে অতিরিক্ত ৯ বিলিয়ন ডলার খরচ করতে হবে। সারের দাম সর্বোচ্চ হওয়ায় আশংকা করা হচ্ছে আগামী বছর হয়তো সার পাওয়াই যাবেনা।

বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী খাদ্যের প্রধান উপকরণ চাল ও ভুট্টার উৎপাদন কমে যাবে। গমের উৎপাদন সামান্য বাড়লে প্রতিকূল আবহওয়া দেখা দিলে তা কমে যেতে পারে। জ্বালানি সরবরাহও কমতে পারে। এতে বৈশ্বিক সংকট ২০২৩ সালে আরও বাড়বে। বিশেষ খাদ্য সংকট প্রকট হতে পারে। চলতি অক্টোবরে ভুট্টার উৎপাদন ১ দশমিক ২২ শতাংশ, চালের উৎপাদন দশমিক ৩৩ শতাংশ কমে যাবে। এর সঙ্গে অন্যান্য পণ্যের উৎপাদনও কমতে পারে।

দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রীর আহবান
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তার বিভিন্ন বক্তব্যে দুর্ভিক্ষের সম্ভাবনার কথা বলছেন। বৈশ্বিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি দুর্ভিক্ষের প্রসঙ্গ টেনেছেন।

শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশে যাতে এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয় সেজন্য এখন থেকে প্রস্তুতি নিতে হবে। বিশ্ব আগামী বছর ‘দুর্ভিক্ষের মতো খারাপ পরিস্থিতির’ মুখোমুখি হতে পারে বলে গত ৬ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বাংলাদেশ যাতে দুর্ভিক্ষের শিকার না হয় সেজন্য খাদ্য উৎপাদনের জন্য প্রতি ইঞ্চি জমি উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করতে হবে।

তিনি সবাইকে সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। গত ১৩ অক্টোবর সেনাবাহিনীর এক অনুষ্ঠানে দুর্ভিক্ষের প্রসঙ্গটি উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ যাতে দুর্ভিক্ষের শিকার না হয় সেজন্য খাদ্য উৎপাদনের জন্য প্রতি ইঞ্চি জমি উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করতে হবে।

১৭ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে খাদ্যের সংকট ঠেকাতে দেশবাসীকে উৎপাদন বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

যে মহামন্দা ধেয়ে আসছে তাতে বাংলাদেশে যেন খাদ্যের অভাব দেখা না যায় সেজন্য সবাইকে উৎপাদন বাড়াতে হবে। যার যা জমি আছে উৎপাদন করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে বিশ্বে যে মহামন্দা ধেয়ে আসছে তাতে বাংলাদেশে যেন খাদ্যের অভাব দেখা না যায় সেজন্য সবাইকে উৎপাদন বাড়াতে হবে। যার যা জমি আছে উৎপাদন করতে হবে, উৎপাদনে মনোযোগী হতে হবে, সাশ্রয়ী হতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের অনেক জায়গা আছে। সরকারি অফিস, বিভিন্ন স্কুলে জায়গা আছে। বিভিন্ন জায়গায় যে যা পারেন বিভিন্ন সবজি উৎপাদন করেন। উৎপাদিত পণ্য যেন নষ্ট না হয় তার জন্য যথাযথ সংরক্ষণের কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী। সামনে তেলজাতীয় ফসলে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে কাজ করার জন্য নির্দেশনা দেন সরকারপ্রধান।

এই কথাগুলো কী প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব ভাবনা? নাকি পরিবর্তিত বিশ্বচিত্র নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সুচিন্তিত মতামতের বহিঃপ্রকাশ? বিশ্বব্যাংক বলছে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক এক শতাংশ নেমে আসতে পারে। সংস্থাটির এই প্রবৃদ্ধি আগের দেওয়া পূর্বাভাসের চেয়ে দশমিক ৬ শতাংশ পয়েন্ট কম।

প্রধানমন্ত্রী আগে থেকেই উৎপাদন বাড়ানোর যে কথা বলছেন সেটি বাস্তবসম্মত। কারণ, খাদ্যের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের উপর নির্ভর করা ঠিক হবে না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সেই আশঙ্কার কথাই শুনিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে সমর্থন করে বিশ্ব ব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেছেন, দুর্ভিক্ষ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে আশংকা প্রকাশ করেছেন সেটি একেবারে অমূলক নয়। প্রধানমন্ত্রী আগে থেকেই উৎপাদন বাড়ানোর যে কথা বলছেন সেটি বাস্তবসম্মত। কারণ, খাদ্যের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের উপর নির্ভর করা ঠিক হবে না।

বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষের সম্ভাবনা কতটুকু?
২০২৩ সালে বিশ্ব খাদ্য সংকটে পড়লে বাংলাদেশও তার থেকে খুব বেশি নিরাপদ থাকতে পারবেনা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্ভিক্ষের বিষয়ে যে ঈঙ্গিত দিয়েছেন তা সমগ্র বিশ্বের সাথেই সম্পৃক্ত। লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষের জন্য বড় ধরণের সংকট তৈরি করেছে।

বাংলাদেশে শুধু মূল্যস্ফীতিই নয় ডলার সংকট, জ্বালানী সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যাও রয়েছে। একদিকে মূল্যস্ফীতি অন্যদিকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের সংকট বাংলাদেশকে অনেক বেশি নাজুক পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশে শুধু মূল্যস্ফীতিই নয় ডলার সংকট, জ্বালানী সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যাও রয়েছে। একদিকে মূল্যস্ফীতি অন্যদিকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের সংকট বাংলাদেশকে অনেক বেশি নাজুক পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশে এখন বার্ষিক গমের চাহিদা এক কোটি টনের মতো, অর্থাৎ চালের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। গমের ৯০ শতাংশই বাংলাদেশ আমদানি করে। কিন্তু চালেও বাংলাদেশ ক্রমাগত আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। গত কয়েক বছর বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বোচ্চ চাল আমদানিকারক দেশ ছিল। আর গত বছর ২৬ লাখ টনের বেশি চাল আমদানি করে বাংলাদেশ চীনের পর দ্বিতীয় স্থানে ছিল।

বৈশ্বিক খাদ্য পরিস্থিতির যে অবস্থা, তাতে ভবিষ্যতে টাকা থাকলেও খাদ্যশস্য পাওয়া যাবে না। অনেক দেশই এর মধ্যে নানারকম খাদ্যপণ্য রপ্তানি নিষিদ্ধ করছে।

বৈশ্বিক খাদ্য পরিস্থিতির যে অবস্থা, তাতে ভবিষ্যতে টাকা থাকলেও খাদ্যশস্য পাওয়া যাবে না। অনেক দেশই এর মধ্যে নানারকম খাদ্যপণ্য রপ্তানি নিষিদ্ধ করছে। ভারত এর মধ্যেই গম এবং চাল রপ্তানির ওপরে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে।

করোনার মধ্যেও রেকর্ড রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলো প্রবাসীরা। এর পরিমাণ হুট করে কমতে শুরু করে। সম্প্রতি ব্যাংকের মাধ্যমে প্রবাসী আয় পাঠানোর হার বেশ কমেছে। এ সংকট ধীরে ধীরে প্রকট আকার ধারণ করছে। এর সমাধান না হলে আগামীতে দেশের অর্থনীতি আরও বড় সমস্যার মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে মেগা প্রকল্পগুলোতে বাংলাদেশের ৪৩ বিলিয়ন ডলারের ঋণ রয়েছে, যা ২০২৪ ও ২০২৬ সালে বাংলাদেশকে পরিশোধ শুরু করতে হবে। ঋণের রাশিয়ার কাছে ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশ রাশিয়া, দ্বিতীয় যাবে জাপানের কাছে প্রায় ৩৫ শতাংশ জাপান ও আর তৃতীয় অংশ চীনের কাছে প্রায় ২১ শতাংশ চীনের কাছে পরিশোধ করতে গিয়ে বাংলাদেশের জন্যে আরো চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠবে।

দায়িত্বশীল হতে পারলে প্রতিরোধ হবে দুর্ভিক্ষ
এ দুর্ভিক্ষ এড়াতে চাইলে এখনই খাদ্য মজুদ গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশে এখনও তেমনভাবে খাদ্যনিরাপত্তা গড়ে তোলা হয়নি। সরকারের খাদ্য মজুত করার মতো গুদামের ধারণক্ষমতা ২০ লাখ টনের কিছু বেশি। অর্থাৎ প্রতিবছর সরকার খাদ্য চাহিদার ৫ শতাংশেরও কম মজুত করে। এত সামান্য পরিমাণ খাদ্য সংরক্ষণ করে খাদ্যের বাজারের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ সরকারের থাকে না।

কৌশলগত মজুত আরও অনেক বাড়াতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই কৌশলগত মজুত আরও অনেক বাড়াতে হবে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যসরকার প্রতিবছর উৎপাদিত ধানের ২০ শতাংশের বেশি নিজেই কিনে মজুত করে।

বেসরকারি খাতে মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় বেতন বাড়াতে হবে। বিদেশ সফরসহ অপ্রয়োজনীয় খরচ কমাতে হবে।

মানুষ খাবার কমিয়ে দিলেও কমপক্ষে ২৯টি খাদ্যসামগ্রী আমদানিতে বর্তমানে উচ্চ কর ও শুল্ক আদায় হচ্ছে। খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের ওপর আমদানি শুল্কের হার কমানো ও বেসরকারি খাতে মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় বেতন বাড়াতে হবে। বিদেশ সফরসহ অপ্রয়োজনীয় খরচ কমাতে হবে।

অতি দ্রুত কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, অর্থ মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, বিডাসহ বেসরকারি খাত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কমিটি করে জাতীয়ভাবে বহুমুখী সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

স্বল্পকালীন পদক্ষেপ হিসেবে এইসব সঙ্কট উত্তরণের উত্তম সমাধান দিতে গিয়ে সিপিডি বলছে, অতি দ্রুত কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, অর্থ মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, বিডাসহ বেসরকারি খাত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কমিটি করে জাতীয়ভাবে বহুমুখী সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেসরকারি খাতে মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিয়ে বেতন বাড়ানো, ওএমএস কার্যক্রম বাড়ানো, দরিদ্র ও অতিদরিদ্র মানুষকে নগদ অর্থ সহায়তা দেয়া, জ্বালানির দাম কমানো, অর্থের জন্য কর জিডিপি বাড়ানোসহ আরও কিছু পরামর্শ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

সংরক্ষিত খাদ্যশস্য খুব সতর্কতার সঙ্গে ব্যয় করতে হবে। সম্ভব হলে মাথাপ্রতি খাদ্য বিতরণের একটা পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে।

যদি ২০২৩ সালে দুর্ভিক্ষ আসে তা কয়েক বছর স্থায়ী হতে পারে। এ সময়ে সংরক্ষিত খাদ্যশস্য খুব সতর্কতার সঙ্গে ব্যয় করতে হবে। সম্ভব হলে মাথাপ্রতি খাদ্য বিতরণের একটা পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে অর্থাৎ সরকারের পক্ষ থেকে একটা রেশনিং পদ্ধতি চালু করতে হবে।

বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষ মোকাবেলা করতে হলে এখন থেকেই দেশের কৃষি উৎপাদন বাড়াতে হবে। কোন আবাদি জমি ফেলে রাখার সুযোগ নেই। সবারই উচিত নিজেদের বাড়ির আঙিনায় কিছু না কিছু সবজির গাছ লাগানো। কখন যে কোনটার দাম বাড়বে তার তো কোন নিশ্চয়তা নেই।

সহায়সম্বলহীন মানুষদের প্রথম বাঁচাতে হবে। আমাদের দেশে প্রায় ২ কোটি মানুষ রয়েছে দারিদ্রসীমার নিচে। এই মানুষেরা দৈনিক ২,১২২ ক্যালোরি পরিমাণ খাদ্য নিজেদের জন্যে জোটাতে পারেন না। দেশের ধনী মানুষরা যাতে দরিদ্র মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসে সে ধরণের কর্মসূচি সরকারকে নিতে হবে। এক্ষেত্রে, সরকার কর রেয়াতের মত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।

বাংলাদেশে কোটিপতির সংখ্যা ১৯ হাজার ৩৫১ জন। এই কোটিপতিরা যদি প্রত্যেকে ৪ সদস্যের ১টি দরিদ্র পরিবারের খাদ্য সরবরাহের দায়িত্ব নেন, তাহলে, প্রায় ৮০ হাজার দরিদ্র মানুষ দূর্ভিক্ষ থেকে বেঁচে যাবেন।

বাংলাদেশে কোটিপতির সংখ্যা ১৯ হাজার ৩৫১ জন। এই কোটিপতিরা যদি প্রত্যেকে ৪ সদস্যের ১টি দরিদ্র পরিবারের খাদ্য সরবরাহের দায়িত্ব নেন, তাহলে, প্রায় ৮০ হাজার দরিদ্র মানুষ দূর্ভিক্ষ থেকে বেঁচে যাবেন। সবাই মিলে আমরা যদি এই ২ কোটি মানুষকে দৈনিক খাদ্য যোগাতে পারি তাহলে দূর্ভিক্ষ ঠেকানো যাবে।

যেহেতু দুর্ভিক্ষের সময়সীমা আমাদের জানা নেই তাই আমাদেরকে প্রথমেই কমপক্ষে ৩ বছরের জন্যে খাদ্য রপ্তানি বন্ধ করে দিতে হবে। বাংলাদেশ প্রতি বছর ১০০ বিলিয়ন টাকা সম পরিমাণ খাদ্য রপ্তানি করে। যেসব খাদ্য রপ্তানি করা হয়, সেগুলো স্বল্প মূল্যে দরিদ্র মানুষদের জন্যে বিশেষ রেশন কার্ডের মাধ্যমে বিতরণ করতে হবে। দারিদ্র সীমার নিচে বাস করা ব্যক্তিদের রেশন কার্ড দিতে হবে। সেই রেশন কার্ডের মাধ্যমে ২,১২২ ক্যালোরি সম-পরিমাণ খাদ্য সরবরাহ করতে হবে।

বাংলাদেশে খাদ্য সংকরে আরেকটি বড় কারণ কালোবাজার সিন্ডিকেট। যে কোন কিছুর বিনিময়ে এগুলোকে সমূলে ধ্বংস করতে হবে। একই জমিতে বেশি ফলন নিশ্চিত করতে হবে। খাদ্য দ্রব্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সারের ক্ষেত্রে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে। সবার কাছে যাতে সার পৌঁছায় সে ব্যবস্থা করতে হবে। যেসব জমিতে খাদ্য নয় এমন শস্য উৎপাদন হয়, সেগুলো বন্ধ করে দিয়ে সেই শস্যচাষ করতে হবে। বাংলাদেশের প্রায় ১ লক্ষ একর জমিতে তামাক উৎপাদন হয়। এই জমিগুলোতে খাদ্য শস্য উৎপাদন করতে হবে।

সরকারকে এই আপদকালীন সময়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন থেকে বেরিয়ে এসে কৃষিতে অনেক বেশি নজর দিতে হবে।

সরকারকে এই আপদকালীন সময়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন থেকে বেরিয়ে এসে কৃষিতে অনেক বেশি নজর দিতে হবে। প্রয়োজনে ভর্তুকি দিয়ে কৃষিজাত পণ্যে দাম কমাতে হবে। প্রাকৃতিক সারের উৎপাদন বাড়াতে হবে। কৃষকরা যাতে খাদ্যের ন্যায্য মূল্য পায় সেদিকে নজরদারি বাড়াতে হবে। এই কঠিন সময়ে আমাদের লক্ষ লক্ষ চিংড়ি চাষের উপকূলীয় পলি মাটির জমিতে ধান, তরি-তরকারি ফলনের বিকল্প চিন্তার কথা ভাবতে হবে।

কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। মনে রাখতে হবে প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদের বড় সমস্যা মূলধনের অভাব। বিদেশ থেকে মহিষ ও গরুর মাংস আমদানি বন্ধ করে আমাদের খামারিদের সুযোগ-সুবিধা দেয়ার কথা ভাবতে হবে। আমাদের দেশে কৃষকদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। লেখাপড়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সবজি, তরি-তরকারি সহ খাদ্য উৎপাদনে সম্পৃক্ত করতে হবে। সাধারণ শিক্ষার চেয়ে কৃষি ও কারিগরী শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। বেকারত্ব কমাতে পারলে সংকট মোকাবেলা সহজ হবে।

দুর্ভিক্ষের কথা শুনে ব্যবসায়ী-মজুতদারীরা যাতে সুযোগ নিতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রতিটি জেলায়-উপজেলায় ভিজিল্যান্স টিম তৈরি করতে হবে।

দুর্ভিক্ষের কথা শুনে ব্যবসায়ী-মজুতদারীরা যাতে সুযোগ নিতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রতিটি জেলায়-উপজেলায় ভিজিল্যান্স টিম তৈরি করতে হবে। মোবাইল কোর্টের সংখ্যা কয়েকগুণ বাড়াতে হবে। দুর্নীতি প্রতিরোধে কঠোর হতে হবে। সিন্ডিকেট ভাঙ্গতে বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনে সেনাবাহিনীকে কাজে লাগাতে হবে।

মানুষ যে প্রচলিতভাবে বিশ্বাস করত দুর্ভিক্ষ হয় খাদ্যের অভাবে, আসলে সেটা সত্য নয়।

অর্থনীতিবীদ অমর্ত্য সেন নোবেল পেয়েছিলেন তার দুর্ভিক্ষ নিয়ে করা গবেষণার জন্য। তিনি পৃথিবীর কাছে দুর্ভিক্ষ নিয়ে যে অসাধারণ তত্ত্বটি উপস্থাপন করেছিলেন সেটি হলো মানুষ যে প্রচলিতভাবে বিশ্বাস করত দুর্ভিক্ষ হয় খাদ্যের অভাবে, আসলে সেটা সত্য নয়।

তিনি পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য দুর্ভিক্ষ নিয়ে গবেষণা করে দেখিয়েছেন সেগুলোতে জনগণের চাহিদার পরিমাণ খাদ্যশস্য থাকার পরও শুধু মানুষের খাদ্যের কাছে প্রবেশগম্যতা না থাকায় দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। এজন্য দেশে পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদিত হলেও দুর্ভিক্ষ হতে পারে। সুতরাং জনগণের কাছে খাদ্য পৌঁছে দেয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণযোগ্য
জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রধান ডেভিড বিসলে-দু’জনই বলেছেন, চলমান খাদ্য সংকট এবং দুর্ভিক্ষের শঙ্কা- দুটিরই কারণ যুদ্ধ ও সংঘাত এবং এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণযোগ্য।

তবে এ জন্য বিশ্বনেতাদের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা। বিশ্ব ব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেন, দুর্ভিক্ষ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে আশংকা প্রকাশ করেছেন সেটি একেবারে অমূলক নয়।

প্রধানমন্ত্রী আগে থেকেই উৎপাদন বাড়ানোর যে কথা বলছেন সেটি বাস্তবসম্মত। বাংলাদেশ যদি উৎপাদন বাড়াতে পারে এবং দরিদ্র মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিতে পারে তাহলে দেশটি পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে।

সেজন্য প্রধানমন্ত্রী আগে থেকেই উৎপাদন বাড়ানোর যে কথা বলছেন সেটি বাস্তবসম্মত। বাংলাদেশ যদি উৎপাদন বাড়াতে পারে এবং দরিদ্র মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিতে পারে তাহলে দেশটি পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে।

কৃষিমন্ত্রী মো. আব্দুর রাজ্জাক গত ১১ অক্টোবর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, দেশে কোনো খাদ্যসংকট হবে না, হাহাকার হবে না, দুর্ভিক্ষ হবে না। তিনি ২৪ অক্টোবর দেয়া আরেক বক্তব্যে বলেছেন, “পৃথিবীর অন্য যে কোনো দেশে খাদ্যের অভাব হতে পারে, দুর্ভিক্ষ হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশ কোনো খাদ্য সঙ্কটে পড়বে না। এই মুহূর্তে দেশে খাদ্যের কোনো হাহাকার নাই, আগামী দিনেও হাহাকার হবে না।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আতিউর রহমান বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শ্রীলঙ্কার মতো অর্থনৈতিক বিপর্যয় হবে না বলে মনে করেন।

সাবেক এই গভর্নর গত ২১ অক্টোবর এক আলাচনায় বলেন, বাংলাদেশের জিডিপির তুলনায় ঋণের হার মাত্র যেখানে ৩৮ শতাংশ, সেখানে শ্রীলঙ্কার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় ঋণের হার ১০৯ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ তুলনামূলক কম। আতিউর রহমান আরও বলেন, আইএমএফ ও বিশ্ব ব্যাংকের মতে বাংলাদেশের ঋণের পরিমাণ জিডিপির তুলনায় নিরাপদ ও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।

বিশ্বে ধান উৎপাদনে ৩য়, সবজি উৎপাদনে ৩য়, আম উৎপাদনে ৭ম, আলু উৎপাদনে ৭ম এবং পেয়ারা উৎপাদনে ৮ম স্থানে থেকে বিশ্বপরিমণ্ডলে সমাদৃত হয়েছে।

ইতোমধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বে ধান উৎপাদনে ৩য়, সবজি উৎপাদনে ৩য়, আম উৎপাদনে ৭ম, আলু উৎপাদনে ৭ম এবং পেয়ারা উৎপাদনে ৮ম স্থানে থেকে বিশ্বপরিমণ্ডলে সমাদৃত হয়েছে। বিশ্বে ধান, পাট, কাঁঠাল, আম, পেয়ারা ও আলু এবং সবজি ও মৎস্য-উৎপাদনে বাংলাদেশ আজ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

২০০৯ সালে খাদ্যশস্যের উৎপাদন ছিল ৩ কোটি ৩৮ লাখ ৩৩ হাজার মেট্রিক টন। বর্তমানে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেড়ে হয়েছে ৪ কোটি ৫৩ লাখ ৪৪ হাজার মেট্রিক টন।” এই তথ্যগুলো নিয়ে আমরাও আশাবাদী হতে চাই, দুর্ভিক্ষ নামক অপচ্ছায়া আমাদেরকে স্পর্শ করতে পারবেনা। খাদ্য উৎপাদনে আমাদের মেহনতি মানুষদের অর্জনগুলো যেন দুর্ভিক্ষের ঘূর্ণিপাকে হারিয়ে না যায়।

শেষ কথা
দুর্ভিক্ষ হাস্যরসের কোন ঘটনা নয়, এটা মানুষের জীবন-মরণের প্রশ্ন। আমাদের ভুলে গেলে চলবেনা এই বাংলায় ১৭৭০ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে (ছিয়াত্তরের মন্বন্তর) ১ কোটি মানুষ মারা গিয়েছিল, ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে (পঞ্চাশের মন্বন্তর) মারা গিয়েছিল ৩০ লক্ষ মানুষ।

ইতিহাসের এইসব নির্মম ঘটনার পুনরাবৃত্তি থেকে মুক্তি পেতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ ও পূর্ব প্রস্তুতির কোন বিকল্প নেই।

স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষে সরকারি হিসেব অনুসারে ২৭ হাজার মানুষ ও বেসরকারি হিসেবে অনুমানিক ১৫ লক্ষ মানুষ প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে মৃত্যুবরণ করেছিল।

ইতিহাসের এইসব নির্মম ঘটনার পুনরাবৃত্তি থেকে মুক্তি পেতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ ও পূর্ব প্রস্তুতির কোন বিকল্প নেই।

জসীম উদ্দীন মাসুদ, লেখক ও গবেষক




খবরটি এখনই ছড়িয়ে দিন

এই বিভাগের আরো সংবাদ







Copyright © Bangla News 24 NY. 2020